Saturday, 7/4/2018 | 12:16 UTC+0
You are here:  / টপ নিওজ / প্রবাস / নজর আলীর নজর সাইদা সারমিন রুমা(মারখাম, অন্টারিও)

নজর আলীর নজর সাইদা সারমিন রুমা(মারখাম, অন্টারিও)

এখনো ভোরের সম্পূর্ণ নীরবতা কাটেনি। সবেমাত্র কিছু কিছু পাখি কিচির মিচির করে ভোরের আলোকে স্বাগতম জানাচ্ছে । অথচ সমস্ত নীরবতা ভেদ করে কিছুক্ষণ পর পর মা’ মা’ ডাক শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেঊ হয়তো তার মা’কে ডাকছে। ডাকতেই পারে। তাতে আশচর্য্য হবারইবা কি আছে? কিন্তু আশ্চর্য্য তখনই হতে হয় কেঊ যদি তার বউকে মা’ বলে ডাকে। আবার তার মা’ যদি সামনে আসেন সে তার মা’কে মা’ ডাকেনা।
আজ থেকে প্রায় পঁচিশ তিরিশ বছর আগের কথা। নজর আলীর তখন অফুরন্ত যৌবন। ঘরে তার টুকটুকে একটি বউ। গ্রামের লোকের ঢল নেমেছিল যেদিন নজর আলী বিয়ে করে বউ এনেছিল ঘরে।গ্রামের সকলের মুখেই ছিল একই কথা, ‘ও নজর অমন পরীর বাচ্চা কই পাইলা? যতন কইরা রাইখো, নাইলে চইল্লা যাইবো দেইখো’। নজর বিয়ে করে সারাক্ষন বউএর কাছে থাকে। এভাবে একদিন দু’দিন তিনদিন করে একমাস কেটে গেলো।নজরের কাছে এখন এক ঘেয়েমি লাগে। ফিরে যায় তার পুরনো স্বভাবে। পরীর বাচ্চা ঘরেই থাকে। নজর আলীর নজর এখন অন্য পরীর বাচ্চার খোঁজে। অথচ বউকে সে সত্যি সত্যিই প্রথম দিন নাম দিয়েছিল পরী। এমনকি আবেগে মা-বোন সকলকেই বলেছিল তার বউয়ের নাম ফুলজান থেকে পরী হলো। বাড়ীর কেউই গ্রাহ্য করেনি। শাশুড়ী ডাকে বউ বলে আর ননদ ডাকে ভাবী বলেই। এই একটি মাস ধরে বউকে বড় সখ করে নজর আলী ডাকে- ‘পরী কই গেলা? পরী এদিকে আস।পরী ভাত দাও। এক মাস পর, নজর আলীর-পরী, নজর আলীর চোখে, পেত্নী হয়ে গেলো। কারন এরই মাঝে আশরাফের কাছে খোঁজ পেয়েছে, চেয়ারম্যা্নের পাশের বাড়ীর রহিমুদ্দির ভাস্তি সখিনা বেড়াতে এসেছে রহিমুদ্দির কাছে।গাঁয়ের রং ফর্সা না হলেও শ্যামলা। নজরের এক কথা- ‘রং তো কতো রকমেরই হয়, তয় সাদা কি আর কালোই কি’। এমন টসটসে দেহতো আর সবার হয়না। এভাবে নজর আলী একের পর এক শিকার খোঁজে বেড়ায়। তার মন কখনো সংসারে বসেনা। সংসারের কোনো মায়া মমতা তাকে আটকে রাখতে পারেনি।

দিনের পর দিন কাটছে, রাতের পর রাত। ফুলজানের সমস্ত অন্তর পুরতে শুরু করেছে। তার সমস্ত স্বত্তার উপর কে যেন পাথর চাপা দিয়ে দিল। ফুলজান আজ বুঝতে পেরেছে পেরেছে কালজয়ী এই প্রেম খেলোয়ারকে আর কিছু দিয়েই জয় করা সম্ভব না। ফুলজানের অন্তরে কষ্টের দুঃখের অতলান্ত মহাসাগর। ফুলজান আর নজর আলীর যুগ্নসত্তা, একটি মিলিত বৃত্তে পেতে পারতো সম্পূর্ণতা। কিন্তু নজর কি এসব বুঝে? সে সর্বদাই নিজেকে ভাবে ক্রুটিমুক্ত, তার কোনো ক্রুটি থাকতে পারে সে কল্পনাও করতে পারেনা।যেনো দোষ শুন্য দেবতাতুল্য।এরই মাঝে নজরের সংসারে এক এক্ করে এলো ফুটফুটে দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে।

অসুখে-বিসুখে ফুলজান রাত জাগে হাসি মুখে, আর এই অতন্দ্র সেবা নজর আলী গ্রহন করে প্রাপ্য হিসেবে।কৃ্তজ্ঞতার যেনো কোনো প্রয়োজনই নেই। তার জন্য বাড়ীর শ্রেষ্ঠতম খাদ্যটি থাকতে হবে।নিদ্রার সময় থাকতে হবে সমস্ত বাড়ীর নিরবতা।কিন্তু অন্যের নিদ্রার সময় তিনি চিৎকার করে বাড়ী মাথায় তুললেও কারো বলার কিছু নেই। ছেলেরা ছোট বেলা থেকেই বাবার প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়েছে। একটু বড় হওয়ায় ফুলজান কতোবার চেষ্টা করেছে ছেলেমেয়েদেরকে বাবার প্রতি যেনো শ্রদ্ধাশীল হয়।কতোবার ওদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করেছে, বাবাদের কোনো দোষ ধরতে নেই।কিন্তু একবার শ্রদ্ধা হারালে কখনো কেউ তা অর্জন করতে পারেনা।নজর আলী সারাক্ষনই তার ছেলেদের চোখে অপরাধী।

ছেলেরা এখন বড় হয়েছে, মেয়েটিও।মেয়েটি যেনো একেবারেই তার মায়ের রুপ, গুন ও আদলটুকুও পেয়েছে। আগে নজরের মা’ও নজরকে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন।এখন আর করেন না। কারন সকলেই বুঝে গেছেন সে একের পর এক শিকার ধরায় ব্যাস্ত। আর ঐ সমস্ত মেয়েরাও আসে। সমস্ত গ্রামের লোকেরাও জানে, নজরের এই কর্ম। কিন্তু তাতেও লজ্জা হয়না।দুছেলে একদিন স্কুল থেকে ফিরে সেকি কান্না, অন্ন বন্ধুরা তার বাবাকে নিয়ে বাজে কথা বলে।এভাবে মেয়েও কাঁদে।তাদের এক কথা-মা’ স্কুলে আর যাইমুনা, অনেক লজ্জা করে, বাবারে লইয়া বাজে কথা কয় সকলে।ফুলজান তার তিন সন্তানকে অনেক বুঝান। পড়ালেখা ছাড়া কখনো বড় হতে পারবেনা, এবং ওরা মানুষের মতো মানুষ হলে ওদের মা’য়ের আর দুঃখ থাকবেনা।ছেলেরা চুপ করে থাকে।মেয়ে এসে মা’য়ের গলা জড়িয়ে ধরে। মা অনেক আদর করে নাম রেখেছে আলেয়া।সব-সময় মেয়েকে বুঝায় মা’গো তোমার নাম আলেয়া, তোমার আলো দিয়া দুনিয়া আলো কইরা তুলবো।মেয়ে সর্বদা মাথা নাড়ে। আর বড় ছেলে জোহর আলী এখন হাঁটি হাঁটি পা পা করে কৈশর ও যৌবনে মাঝে পা রেখেছে।তার এক বছরের ছোট করম আলী।

জোহর আলী আজকাল প্রায় মায়ের কাছে টাকা পয়সা খোঁজে, না দিতে পারলেই গালিগালাজ করে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এভাবেই চলে প্রায়। একদিন ভোরে এলাকার পুলিশ আসে নজরের বাড়ী। নজর অবাক। ভাবে এতটি বছর কত কিছুইনা করলাম, কই কখনতো পুলিশ আসেনি খোঁজ নিতে।পুলিশ জানায় নজরের ছোট করম আলী চুরি ও ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত। খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো করম রাতে বাসায়ই ফিরেনি। নজর আলী তাও জানেনা। পুলিশ নজরকে বলে, ‘নজর তোমার এখন থামা উচিত, ঘরের দিকে মন দাও। বাচ্চাগুলোতো তোমার মতই হইলো। তোমার বড় ছেলেও কিন্তু ঘরে নাই। গতকাল এরেষ্ট করেছি-ড্রাগ ব্যবসায় জড়িত’।

নজর আলী যেনো এতোদিন পর নিজ সংসারে পা রাখলো। তার চারিপাশের সকলেই যেনো বড় অচেনা। এবার বউকে ডাকে, ‘বউ-অ-বউ ছেলেদেরকে কি মানুষ করতে পারনা? কি ছেলে মেয়ে জণ্ম দিছো যে মানুষ হয়না’। ফুলজান যা কখনই করে নাই আজ তাই করলো। তীব্র চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, ‘আপনার মা’কে জিজ্ঞেস করেন-তিনি কেমন ছেলে জন্ম দিয়েছিলেন যে, মানুষ হইল না।

তার ছেলে হইয়া আপনে কি কম কষ্ট দিছেন সকলেরে। তা আপনার ছেলেরা কি হের চাইতে বেশি ভালো হইবো?নজর আলী হুঙ্কার দিয়ে উঠে সিংহের মতো। তারপর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে।

এরই মাঝে একদিন আলোয়ার বিয়ে হয়ে। আলেয়া চলে যায় দূরে বাবা মা’র সংসার ছেড়ে। এই প্রথম নজর আলী টের পেল তার সংসারের প্রতি অনেক কর্তব্য ছিল। মেয়ের জন্য ফুলজানের মন সারাক্ষন কাঁদে। সবটা ঘর বাড়ী যেনো একেবারে ফাঁকা হয়ে গেলো। কষ্টের ও ব্যাথার অনুভূতির এই প্রত্যক্ষতাকে ফুলজান কিছুতেই ভাষায় প্রকাশ করতে পারেনা। হয়তোবা এ ধরনের অনুভূতির জন্য ফুলজানের মনে কোনো ভা্ষাই তৈরী হয়নি। এভাবেই চলে দুনিয়া, এটাই পৃথিবীর নিয়ম। আলেয়া একদিন বাবার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছে। অথচ একি! আলেয়া কান্না করছে,-‘বাবা আমি আর যাবনা ঐ বাড়ীতে ফিরা। সে আমারে ঘরে রাইখ্যা অন্ন মেয়ে মানুষ নিয়া ফুর্তি কইরা বেড়ায়’। ফুলজান শান্ত স্বরে বললো, ‘আলেয়া মা’ মনে রাখবা অহন থাইক্যা আমরা তোমার দুরের। তোমার জামাই হলো আপন।ঘরের বউ হইছো এহন ঐ বাড়ীর। তোমারে আরও কতো কি সহ্য করতে হইতে পারে। ফুলজানের মুখের কথা পুরোপুরি শেষ না হতেই নজর আলী গর্জন করে উঠে-‘কি কইলা বউ হইছে দেইখা যা তা সহ্য করবো? আমার এত্তো আদরের মাইয়ারে বিয়া কইরা অন্য মাইয়া লইয়া ফুর্তি করে, এত বড় সাহস! আমি আইজই থানায় যাইমু, ডায়রী করমু অর নামে। আমি অর পিরিত ছুটামু। আলেয়া তুই এ বাড়ীতেই থাক, যাবিনা অর কাছে।অরে আমি খুন করমু’। ফুলাজানের বুক থেকে একটি আত্ন-বেদনার দীর্ঘ শ্বাস বের হয়ে আসে।তার দুঃখ বিষাদময় হ্নদয়ের অনুভুতি প্রকাশের কোনো স্থান নেই।সামনে যেন এক অন্তহীন মরুভূমি। তার জীবনে যেন আজ আঁধারের জোয়ার নেমেছে।

এদিকে জোহর আলী বেশ ক’বারই জেলে গিয়েছে। কখনো জেল কখনো বাড়ী এভাবেই কাটে। সময়ও এগিয়ে চলে নির্দিষ্ট সূচনা থেকে নির্দিষ্ট সমাপ্তির দিকে। নজর আলী একদিন ফুলজানকে ডেকে বলে-‘অ বউ একটা পো্লাপাইনও মানুষ হইলোনা, মাইডাও সুখি হইলোনা। কি পাপ করছিলাম? এমন হইলো কেনরে বউ’? ফূলজান কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েই আছে। তার অন্ত্রে জমে আছে পর্বত সমান বোবা কান্না।কিন্তু এদিকে নজর আলীর চোখের ঘুম কে যেন কেড়ে নিয়েছে। দিন নেই রাত নেই তার একই ভাবনা মেয়েটা কেনো সুখী হলোনা, জামাই কেনো চরিত্রহীন, ছেলেরা কেনো মানুষ হলোনা? মাঝে মাঝে বড় ছেলেকে বুঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো হয়না। একদিন ছোট ছেলেকে কাছে পেয়ে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ছোট ছেলে তীর্ব আক্রোশে ফেটে পড়ে-‘বাবা আমারে কিছু কউনের আগে নিজের অতীত দেইখ্যো। আমাগো অধপতন হইছে তোমার লাইগ্যা, আলেয়ার কথা কও হেও তোমার লাইগ্যাই। মা’র কথা মনে আছে বাবা? মা’ও এই আলেয়ার মতই কাঁনতো। ছোট্ট বেলা থাইক্যা দেখছি মা’ তোমার অত্যাচার মুখ বুইজ্যা সহ্য করতো । আর আমরা সহ্য করতে না পাইরা খারাপ হইয়া গেছি বাবা’। নজর আলীর মুখে যেন আজ কেউ খিল দিয়েছে। মুখে কোনও কথা নেই।

নজরের মা’ চোখে দেখে না। অনেক রোগ বাসা বেঁধেছে। তাই ফুলজান নিজ হাতে শাশুড়িকে খাইয়ে দেয়। নজর আলী এসে বললো-‘দাও আইজ আমি মা’রে খাওয়াইয়া দেই’। বৃদ্ধা মা’ চিৎকার করে করে বলে উঠলেন-‘না তর হাতে খামুনা, তুই যা এখান থাইখ্যা। যেই বউরে তুই এত্ত কষ্ট দিছস, হে কিন্তু একদিনের লাইগ্যাও তর মা’রে কষ্ট দেয় নাই।মন দিয়া শা তর মা’য়েরেই সেবা করছে’। নজর আলী মাথা নত করে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। তারপর মাঠের পাশে বড় বট গাছেটার নিচে হেলান দিয়ে বসলো।নজর আলীর মুহুর্তেই মনে পড়ে গেলো, ফুলজানকে যেদিন প্রথম বউ করে ঘরে আনে, কি সুন্দরইনা ছিলো।পুরো গ্রাম শুদ্ধ লোক তার রুপের প্রশংসা করতো। এমনকি ফুলজানের রূপের মোহে একদিন পরীও ডেকেছিল নজর ফুলজানকে। যার ঘরে এতো সুন্দর বউ ছিল , সে কেনো গিয়েছিল অন্য মেয়েদের দারে দারে ? যার ঘর এত সুন্দর ফুল সে কিনা ফুল খুঁজেছে বনে বনে! কোন দিন ফুলজানকে একটু ভাল করেও দেখেনি।হঠাৎ কেন যানি নিজেকে বড় বেশি ঘেন্না লাগলো। ভাবতে ভাবতেই উঠে দাঁড়াচ্ছিল হঠাৎ মাথাটি একেবারে টলে উঠলো। অনেক কষ্টে বাড়ী ফিরল। তার দু’দিন পর হঠাৎ নজর অজ্ঞান হয়ে গেল।ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তার বললো নজরের শরীর প্যারালাইজড হয়ে গেছে, কথা বলতে পাড়বেনা। বেশ বড় রকমের ষ্ট্রোক হয়েছে। অল্পের জন্য বেঁচে গেছে।

ফুলজান সারাক্ষনই সেবায় রত। এখন আর কোনো পরীর বাচ্চারা আসেনা সেবা করতে। এভাবে কেটে যাচ্ছে দিন। ফুলজান কেঁদে কেঁদে হয়রান। গ্রামের সকলে বলাবলি করছিল এটা নজরের সাজা। কিন্তু ফুলজান এমন সাজা চায়না। ফুলজান যেনো ধরেই নিয়েছে যত কষ্ট,যত জালা , যত সাজা সে একাই বহন করবে। এসব যেন আর কারোর জন্য নয়। এদিকে সে সে শুধু ডাক্তারের উপরে ভরসা করে বসে নেই। এরই মাঝে সে যত কবিরাজ ফকির দরবেশ সকলের কাছেই গিয়েছে। না নজরের অবস্থার কোনো উন্নতিই হয়নি। ফুলজান প্রতিদিন তার স্বামীকে কথা বলানোর চেষ্টা করে, হাত-পা নাড়ানোর চেষ্টা করে। যেমন করে মা তার ছোট শিশুকে শিখায়। প্রতিদিনই বলে-‘বলেন আল্লা, বলেন বলেন আল্লা’ নজর আলী ফ্যাল ফ্যাল করে বউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।ডাক্তার বলেছে চেষ্টা করতে করতে হয়তো কখনো কথা বলতেও পারে। তাইতো ফুলজানের এই স্কুল খোলা।আর একটি মাত্র ছাত্রের একটি মাত্র শিক্ষিকা। চারিপার্শকে অবাক করিয়ে দিয়ে ফুলজানের ছাত্র একদিন একটি শব্দের উচ্চারন শিখে ফেললো। তবে ফুল জানের শিখানো কোনো শব্দ নয়, শুধু একটি শব্দ মা’। ফুলজান বিরক্ত হয়-‘কই হারাডাদিন কষ্ট কইরা আল্লা ডাক শিখাই আর হে ডাহে মা’। এরপর থেকে ব্যকুল হয়ে মা’ মা’ ডাকতে থাকে।শেষ পর্যন্ত অন্ধ অসুস্থ মা’কে তার সামনে এনে বসানো হলো তাতেও মা’ মা’ চিৎকার থামেনা।

ভোরে নজর ঘুম ভাংগার পর থেকেই শুরু করেন মা’ মা’ চিৎকার আর রাতে ঘুমানোর পর থামে। এরই মাঝে সকলে আবিষ্কার করলো নজর ফূলজানকে না দেখলেই মা’ মা’ শুরু করে, আর ফুলজান যখন সামনে আসে তখন তার চিৎকার থেমে যায়। বাধ্য শিশুর মতো সে ফুলজানের সমস্ত কথা শুনে। এরই মাঝে নজরের মা মারা যান। বড় ছেলে বিয়ে করেছে। এমনকি ছেলের বউ শশুড়কে খাওয়াতে গেলেও খাবেনা। এক মাত্র ফুলজানের হাতেই খাবে, গোসল করবে, বাথ্রুম সারবে, সব –সব কিছু। মা যেমন ছোট শিশুর যন্ত্রনা সহ্য করে, ফুলজানও তেমনিভাবে সহ্য করে। প্রতিদিন পাড়ার সকলের ঘুম সকলের ভাংগে নজরের মা’ মা’ চিৎকারে। পাড়া প্রতিবেশী ও আত্নীয় স্বজনের মধ্যে মৃদুগুঞ্জন- এ কোন ধরনের বাড়াবাড়ি।মুরুব্বীরা ছিঃ ছিঃ শুরু করেছে। সকলের এককথা নজর কল্পনাও করতে পারেনি, কি ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। ফুলজান সমস্ত তীরষ্কার মাথায় পেতে নিয়ে প্রতিদিন সেবার ফাঁকে ফাঁকে নজরকে আল্লা ডাক শিখানোর আবারও চেষ্টা করে। অথচ নজরের মুখ দিয়ে একটিবারও আল্লা ডাক আসেনা। সে দ্বিগুন উৎসাহে মা’ মা’ করে চিৎকার করে ডাকতে থাকে।

এদিকে আলেয়ার স্বামী তাকে ঐ বাড়ীতে আর যেতে দিবেনা। কারন যার বাবা বউকে ডাকে ডাকে মা’ সেখানে যাওয়ার কথা আর থাকা কোনটাই চলতে পারেনা। সেবার আলেয়া যাওয়ার সময় বলেছিল- ‘মা’গো বাবা তোমারে এইডা কি ডাকে। অন্য কিছু ডাকতে পারেনা।আমারে তোমাগো জামাই এই বাড়ীত আর আইসতে দিব না’। ফুলজান কষ্ট পেতে পেতে এখন এক কঠিন মানবীতে পরিনত হয়েছে। এখন আর কোন কষ্ট তাকে ছুঁতে পারেনা। মেয়ের দিকে শুধু তাকিয়ে বললো-‘অসুবিধা কি নিজ স্বামীর বাড়ীতেই থাকবি।আমিতো আর তোর বাপেরে ফালাইয়া দিতে পারুমনা’। আলেয়া চলে যায় স্বামীর সাথে। এরই মাঝে অনেকদিন কেটে গেছে। একদিন ছোট ছেলে করমের বিয়ে ঠিক হয়। করম আলেয়াকে আনতে গিয়েছিল। কিন্তু আলেয়ার স্বামী আলেয়াকে কিছুতেই ছাড়বেনা। অথচ আর দু’দিন পরই করমের করমের বিয়ে। করম খুব মন খারাপ করে ফিরে আসে। ফুলজানের মাথায় আগুন ধরে যায়। সে করমকে সাথে নিয়ে ছুটে যায় মেয়ে বাড়ী। গিয়ে বুনো বাঘিনীর মতো চিৎকার করে ডাকলো-‘আলেয়া চল আমার সাথে’।ভিতর থেকে আলেয়া ও তার স্বামী বের হয়ে আসে। আলেয়ার স্বামী মুত্তালিব বললো-‘না আলেয়া যাইবোনা ঐ বাড়ীতে’। মুত্তালিবের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে হুংকার ছেড়ে বলে উঠলো ফুলজান-‘ঐ ব্যাটা মাইয়ারে আটকাইয়া রাখস, আবার বড় বড় কথা। অন্যের চরিত্রের কথা কোন মুখে কস ? তুঁই কি ধোঁয়া তুলসী পাতা? তোর পরিনতি কি হইবো ভাবতে থাক। আলেয়া চল আমার সাথে। আলেয়া তার মায়ের সাথে চললো। মুত্তালিব হাঁ করে শাশুড়ী এবং বউয়ের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলো।

করম আলীর বিয়ে।সকলেই ব্যস্ত। ফুলজানের এক মুহুর্তও অবসর নেই। হঠাৎ সেই গগন ভেদ করে মা’ মা’ চিৎকার শুরু হলো।ফুলজানের আজ দেরী হয়ে গেছে নজরকে খাওয়াতে। তাড়াতাড়ি খাওয়া নিয়ে এসে দেখে নজর অভিমান করেছে, খাবেনা। ফুলজান বারবার বুঝাল আজ করম এর বিয়ে। নজর আলীর দুচোখ বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।ফুলজান সামনে থেকে সরলেই মা’ মা’ বলে চিৎকার শুরু করে।আজ যে কতো কাজ।মোটেও বসে থাকার সময় নেই।অথচ কোনো কাজই সে করতে পারছেনা। একটুখানি সরলেই সেকি বিকট মা’ মা’ চিৎকার। তবে অন্যদিনের চেয়ে আজ যেন একটু বেশিই ডাকাডাকি করছে।ফুলজান ছাড়া তার এই মুহুর্তে যেন চলবেনা।অথচ এমন একটা সময় ছিল যখন ফুলজান অনেক কামনা করতো নজর আলী তার সাথে থাকুক, শুধু তাকেই ভালবাসুক। কিন্তু প্রতি নিয়ত তাকে খালি বকা ঝকাই শুনতে হতো। শেষের দিকে ফুলজানের ক্রুটি যেনো বেড়েই যাচ্ছিল। প্রতিদিনই অপমান জনক ও অপ্রীতিকর কিছু না কিছু ঘটেই যাচ্ছিল। নজর আলীর এরূপ চিৎকারের মাঝেও ফুলজান তার কাজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এবার করমকে সাজায়।নিজ হাতে ছেলেকে পাগড়ি পড়ায়। তারপর দুতভাত খাইয়ে দেয় ছেলেকে। একটু পরেই বর যাত্রা করবে সকলকে নিয়ে। সব মিলিয়ে এগারজন বর যাত্রী। ছেলেকে নিয়ে নজরের সামনে আসে।করম এসে বাবার পায়ে হাত দিয়ে ছালাম করে। ছেলের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল। যার অর্থ কেউ বুঝেনি।

বাড়ীর সকলেই চলে গেছে বরযাত্রী হয়ে। ঘরে শুধু ফুলজান আর নজর আলী।নজর আলী মা’ মা’ ডাকে।ফুলজান কাছে আসলো। নজর আলী ফুলজানের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। এ তাকানো যেনো কেমন অস্বস্থিকর লাগছিল ফুলজানের কাছে। শরীরময় কম্পন অনুভব করলো। দৌড়ে পালাতে ইচ্ছে হচ্ছিল।কিন্তু এখন আর আপ্রান চেষ্টা করলেও পালাতে পারবেনা।কারন নজর আলীর নজর এখন আর কাউকে খোঁজেনা, তার নজর এখন শুধুই এক জনের দিকে।

LEAVE A REPLY

Your email address will not be published. Required fields are marked ( required )

1 + two =

The YCC News Japan

we will bring you the latest news from all over the world on Music, Atrists, Fashion, Musical events that you are looking for.

Find Us On Facebook

Contact Information

CHIBA-KEN MATSUDO-SHI
HON CHO 14-20
POST-COD: 271-0091, JAPAN.
Email : info@theyccnews.com
Mobile : 090-2646-7788
(IMO, WhatsApp, Viber, Tangu, Line)
Skype: ycc-masudo
Skype: ycclivetv.com
YCC JAPAN CO, LTD
Editor : Masud Ahmed