১৮ দলের ২৪ নেতার বর্ণনায় হাই সিকিউরিটি জেলের ‘মৃত্যুপুরী’

হাইসিকিউরিটি সেলের কষ্টের দিনগুলো কথা যেন ভোলার নয়। এমন ঘরে তাদের রাখা হয়েছিল যেখানে তীব্র মনোদৈহিক কষ্টের নিগড়ে পড়ে জীবনীশক্তি নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না তাদের। এই তারা হচ্ছেন সম্প্রতি কারামুক্ত ১৮ দলের ২৪ নেতার।

সেখানে তাদের কষ্টের কথা শোনার ছিল না কেউ। কাউকে কোনো অভিযোগ ‍জানানোর সুযোগ ছিল না কারও। স্রেফ আল্লাহর ওপরই ভরসা করে সময় পার  করতে হয়েছে জেলের ঐ দিনগুলো।

“কথা বলতে চাইলে কারা রক্ষীরা এড়িয়ে চলতো। তখন মনে হতো এ যেন এক মৃত্যু পুরি।”

সেখানে তাদের শুধু আবদ্ধই রাখা হয়নি শারীরিক, মানসিক, সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করলেন সম্প্রতি হাইসিকিউরিটি জেল থেকে মুক্ত হওয়া ১৮ দলীয় জোটের ওই চব্বিশ নেতা।

এর মধ্যে দু’জন ছিলেন ১৮ দলীয় জোটের। এনপিপির চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নীলু ও জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান। বাকিরা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।

যুবদল সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরব, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবীব উন নবী খান সোহেল, সাধারণ সম্পাদক মীর শরাফত আলী সপু, ছাত্রদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সাধারণ সম্পাদক আমীরুল ইসলাম খান আলীম, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা কামরুজ্জামান রতন, আজীজুল বারী হেলাল, ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রশিদ হাবিব, সাংগঠনিক সম্পাদক আনিছুর রহমান খোকন, ছাত্রদল ঢাবির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ওবায়দুল হক নাসির, ছাত্রদল নেতা কামাল আনোয়ার আহম্মেদ, যুবদল নেতা রফিকুল ইসলাম মজনু, স্বেচচ্ছসেবক দল নেতা ইয়াসীন আলী, যুবদল নেতা এস এম জাহাঙ্গীর (এখন জেলে), বিএনপি নেতা ইউনুস মৃধা, বিএনপি নেতা নবী সোলায়মান, বিএনপি নেতা এল রহমান, আনোয়ারুজ্জামান, বিএনপি নেতা আব্দুল আজিজ, ছাত্রদল নেতা বিল্লাল হোসেন তারেক, ছাত্রদল নেতা মো. রাসেলসহ ২৪ জন নেতা কাশিমপুর কারাগারের হাইসিকিউরিটি সেলে ছিলেন প্রায় দেড় মাস।

এনপিপির চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নীলু ছিলেন এক মাস। তিনি এর আগেও জেলে গেছেন। পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরণ করেছেন ৩ বার। কিন্তু কখনও তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীদের সঙ্গে থাকতে হয়নি। কিন্তু এবার তাই করা হয়েছে, জানালেন নীলু।

বারবার জেলযাত্রার অভিজ্ঞতায় প্রথম দফায় মাত্র দু’দিন ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১১ বার জেলে গিয়েছেন। তবে এবারের মতো এতো কষ্ট ভোগ করতে হয়নি কখনও।

এবার জেলে গিয়ে অপমানিতও হয়েছেন বলে জানালেন নীলু। বাংলানিউজকে সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনায় তিনি বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটের ভেতরে তাকে ইচ্ছা করে ৯ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে নেয়া হয় হাসপাতালে। প্রথমে (শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) পিজি হাসপাতালে। সেখানে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর জনা গেল, সিট নেই। এরপর তাকে নেয়া হয় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখানেও সিট পেতে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, মনে হয়েছে এদের কষ্ট দেয়া দেয়া ছাড়া করার আর যেন কিছুই ছিল না।

নীলু বলেন, জেল কর্তৃপক্ষও তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে নাই। নিম্নমানের বদ্ধ রুম, এরমধ্যে ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকতো না। অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তার সাহেবদের যেন কিছু বুঝে উঠতেই সময় লেগেছে কয়েকদিন। ততক্ষণে মৃত্যুর মুখ দেখতে হয়েছে তাকে।

তবে পুলিশী আচরণ অতটা খারাপ ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে তিনি মনে করেন, সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করে নিচের কর্মকর্তারা কি ধরনের আচরন করবেন তাদের সঙ্গে।

জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান বাংলানিউজকে বলেন, জেল তার বাড়ির মত। এবার নিয়ে ২৮ বার জেলে গেছেন তিনি। তুলনামূলক এবার একটু বেশি কষ্ট হয়েছে।

প্রায় দেড় মাসের মত জেলে ছিলেন তিনি। তার জেল এখন সয়ে গেছে। এতে কিছু মনে করেন না তিনি।

ছাত্রদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, জেলে কষ্ট দিতেই নেয়া হয়েছিল। তাদের কয়েকবারই জেলগেট থেকে আটকিয়ে ডিবি অফিসে নেয়া হয়েছে। “শুধু জেলে নয়, বিভিন্ন কায়দায় আমাদের হয়রানী করা হয়েছে” বললেন টুকু।

তিনি আরও বলেন, “হাই সিকিউরিটি সেল জেলের সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গা। এ সেলে থাকলে মনে হয় আর কোনোদিন হয়তো মানুষের মাঝে ফিরে যেতে পারবো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহবায়ক আব্দুল মতিন সম্প্রতি জেলে যাওয়ার অবিজ্ঞতা বণর্না করতে গিয়ে বললেন, “ওখানে আল্লাহকে বলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। এভাবেই তাদের কয়েকজনকে বদ্ধ ঘরে রাখা হয়েছে প্রথম ৭দিন। সেল থেকে বের হতে দিত না ঐ ঘরের কাউকে। আবদ্ধ একটি ঘরে রাখা হয়েছে তাকেসহ কয়েকজনকে। সেখানকার কষ্ট বলে বণর্না করা যায় না।”

তিনি বলেন, “জেলের ভেতরে কারা পুলিশ প্রথম দিকে আমাদের সঙ্গে কথা বলতো না। বদ্ধ ঘরের সেই গরম আর অসহায় জীবনের কথা মনে পড়লে মনটা এখনও কেমন হয়ে যায়। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। বিরোধী দলের রাজনীতি করি এটাই ছিল তার অপরাধ।”

মুক্তি পাওয়ার পরও জেল গেট থেকে তাকেসহ কয়েকজনকে কয়েকবার আটক করে ডিবি পুলিশ। কেন তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে জানতে চাইলে ঐ পুলিশ কর্মকর্তারা শুধু বলতেন সবকিছুই ওপরের নির্দেশ।

তিনি বলেন, “ডিবি অফিসে এনে একটি রুমে আটকে রেখে লাইট জ্বালিয়ে রাখা হত। ঐ রুমে ঘুমানোর কোনো সুযেগ ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কি কারণে ডিবি অফিসে আমাদের ছবি তোলা হয় এবং বাড়ির সবকিছু জানাতে বলে তা বুঝতে পারিনি আজও।”

জেলের বেতরে আর একটি কষ্টের কথা বলেন তিনি। চারগুণ দামে মাছ-মাংস কিনে পাক করিয়ে খেতে হতো। ঐ সময় জেলের ভেতরের একটি সেকেন্ড এক এক বছরের মত মনে হতো তার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম আহবায়ক ওবায়দুল হক নাসির ১ মাস ১৩ দিনের জেলের বণর্না করতে গিয়ে বলেন, “পুলিশ খারাপ আচরণ করেনি, শারীরিক নির্যাতনও করেনি। তবে মানসিক নির্যাতন করেছে।”

তিনি বলেন, “আমাদের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সঙ্গে রাখা হয়েছে। আমরা ডিটেনশনে ছিলাম না তার পরেও ২৪ ঘণ্টাই লকআপে রাখা হয়েছে, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে দেয়নি। হাজতি হিসাবে যে সুযোগ সুবিধা দেয়ার কথা তাও দেয়া হয়নি কষ্ট দেয়ার জন্য।”

হাই সিকিউরিটি সেল একটি মরুভূমি এলাকা। একে তো বিদ্যুৎ থাকতো না ২০ ঘণ্টা, তারমধ্যে মশার আক্রমণ, প্রচণ্ড গরম যেন মৃত্যুর মুখ দেখিয়ে ছেড়েছে তাদের।

নাসির বলেন, “মানবতাবোধ বলতে এ সরকারের কিছুই নেই। অসুস্থ হলে ঔষধ দেয়া হতো না। একটি রুমে তিন চারজন থাকতাম, গোসলের জন্য কোনো বালতিও ছিল না। রুমের ভেতরে ছিল  প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। এরপর আবার মুক্তি পাওয়ার পর জেলগেট থেকে দু’বার আটক করে অস্বাভাবিক কষ্ট দিয়েছ সরকার।”

তিনি বলেন, “এটা আমার দ্বিতীয়বার জেলে যাওয়া। এর আগে একবার জেলে গিয়েছেন। ঐ সময় একমাস ১৭ দিন জেলে থাকতে হয়েছে।” তার মাথার উপরে ৩৬টি মামলা ঝুলছে বলে জানালেন।

সরকারের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিবুন নবী খান সোহেল বলেন, “অপরাধ না করেও চোর-ডাকাত আর ফাঁসির আসামির সঙ্গে থাকতে হয়েছে। বদ্ধ ঘরে প্রচণ্ড গরমে মনে হয়েছে এই মনে হয় জীবনটা চলে যাচ্ছে। গরমের যন্ত্রণায় অনেকে ঘুমাতেই পারেননি। বমি করে বাঁচতে চিৎকারও দিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “তবে যেখানে রাখা হয়েছে এটা অবিচার করা হয়েছে। রাজিনৈতিক দলের কর্মীর সঙ্গে যে আচরণ করা দরকার সরকার তা করেনি।”

সরাফত আলী সপুকে ফাঁসির লকআপে রাখা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় একবারও খোলা হতো না সেলের দরজা। তারপর জেলগেটে বারবার গ্রেফতার। ডিবি অফিসে এনে বসিয়ে রাখা ছিল খুবই কষ্টের। তবে মিথ্যা মামলা দিয়ে সরকার যা করেছে তা অতিমাত্রায় নির্যাতন।”

যুবদল সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরব বাংলানিউজকে বলেন, “অনেক কষ্টের জায়গা হাই সিকিউরিটি সেল। এখানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রাখা হয়। এই সেলে রেখে শুধু কষ্টই দেয়নি, আমাদের অপমানও করেছে।”

তিনি বলেন, “এবার জেলগেটে তিনবার আটক করা হয়েছে। ডিবি অফিসে এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। রিমান্ডের নামে অনেক কষ্ট দেয়া হয়েছে।”

তিনি জানান, এ সরকারের সময় তার নামে কত মামলা হয়েছে তার সঠিক তথ্য তিনি নিজেও বলতে পারবেন না। কারণ, অনেক মামলায় গ্রেফতার হওয়ার আগে জানতে পারেন না। তবে, তার ধারণা, তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে প্রায় ২০টি।

তিনি জানান, এ পর্যন্ত এ সরকারের সময় ৫ বার জেলে গেছেন। সর্বশেষ গত ১৬ মে গাড়ি পোড়ানো মামলায় জেলে নেয়া হয়। প্রায় দুই মাসের মত জেল থাকতে হয় তাকে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির নেতা কামরুজ্জামান রতন বাংলানিউজকে জানান, ফাসির আসামিদের সঙ্গে রাখা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টাই বদ্ধ ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে মনে হয়েছে এই বুঝি মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। ঐ কষ্টের ধকল এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। এ জন্য হাসপাতালেই থাকতে  হয়েছে অনেক দিন।

তিনি বলেন, “রিমান্ডের কষ্ট বলেই বা কি লাভ! থানা হাজত খানায় দিনের পর দিন রাখাও আর এক কষ্টের।”

রতন জানান, তার বিরুদ্ধে ২০টির মত মামলা আছে। তিনি রাজনীতি করার কারণে এ পর্যন্ত ৫ বার জেলে গেছেন।

ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক আমীরুল ইসলাম আলীম বলেন, “কষ্টের চেয়েও লাঞ্ছিত করেছে অনেক। হাইসিকিউরিটি সেল মৃত্যুর আগের মুহূর্তের পর্ব। এখানে আমাদের রেখে সরকার রাজনৈতিক নেতাদের অপমানিত করেছে।”

তিনি বলেন, “গরম আর মশার কামরে প্রতি মুহূর্তেই আঁতকে উঠতাম আমরা।”

এছাড়া ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রশিদ হাবিব, সাংগঠনিক সম্পাদক আনিছুর রহমান খোকন, নেতা কামাল আনোয়ার, যুবদল নেতা রফিকুল ইসলাম মজনু, স্বেচচ্ছসেবক দল নেতা ইয়াসীন আলী, বিএনপি নেতা ইউনুস মৃধা, বিএনপি নেতা নবী সোলায়মান, বিএনপি নেতা এল রহমান, বিএনপি নেতা আনোয়ারুজ্জামান, বিএনপি নেতা আব্দুল আজিজ, ছাত্রদল নেতা বেলাল হোসেন তারেক, ছাত্রদল নেতা রাসেলের অভিযোগ একই। তারা দেড় মাস মৃত্যুর মুখামুখি অবস্থান করে ফিরে এসেছেন বলে জানান।

This website and its content are copyright of “theyccnews.com” - © “[theyccnews.com]”. All rights reserved. It is strictly prohibited to copy, cut, download, extract any picture/video/information etc of this web based world wide circulation. Note: You may ask for permission by email, editor@theyccnews.com, to use any content of this website and wait for written permission.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>